Socialize

অমাবস্যার চাঁদ পর্ব ৫

অমাবস্যার চাঁদ
পর্ব ০৫
writer Tanishq Sheikh Tani
না! না! বুড়ি চমকে ওঠে মাহিদার যাওয়ার কথা শুনে।সে বোবা মানুষ কারুর সাথে কথা কয় না।তার মাথায় একটু সমস্যা আছে মানুষ দেখলেই উল্টো পাল্টা আচার আচরণ শুরু কইরা দেয়।তাই আফনে যাইয়েন না।আমি খাবার প্লেটে তুইলা দিতাছি এইগুলা লইয়া বিছানার উপর রেখে আসেন।খবরদার তার সাথে কথা কইবার চেষ্টা করবেন না তাইলে তুলকালাম কান্ড ঘটাইয়া ফেলবো।নাতনীডার মাথায় বহুত দোষ আছে গো মা।
বুড়ি সবজির সব আইটেম দিয়া প্লেট টা সাজিয়ে লিপির হাতে তুলে দিল।
চাচি মাংস দিলেন না তো প্লেটে?
সে মাংস খায় না।যাও মেয়ে এই খাবার গুলো রেখে আসো তার ঘরে লিপিকে উদ্দেশ্য করে বলে বুড়ি।
মাহিদা চৌধুরীর মন কেমন যেন করে এসব কথা শুনে।মেহের ১০ বছর আগেও মাংস খেতো কিন্তু যেদিন ওর জমজ বোন রিমাসা কক্সবাজারে হারিয়ে গেলো তার একমাস পর থেকে মাংস দেখলেই বমি করা শুরু করে।আর এখন শুনছে বুড়ির নাতনী মাংস খায় না।রিমাসার কথা মনে উঠতেই চোখে পানি চলে আসে মাহিদা চৌধুরীর। মেয়েকে হারিয়ে যাওয়ার শোক কিছুতেই কাটাতে পারি নি স্বামী রাশেদ চৌধুরী তাই তো কিছুদিন পরেই হঠাৎ স্ট্রোক করে মারা যায় তিনি।
চলবে,,,অমাবস্যার চাঁদ
পর্ব০৫
writer Tanishq Sheikh Tani
রবিন এসে দেখে মাহিদা চৌধুরীর বাড়ির সামনে মানুষের ভীর।ভীর ঠেলে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই দেখে কাজের মেয়ে লিপির লাশ ফ্লোরে সাদা কাপড়ে ঢাকা।ঘারটা কেউ মুচড়ে মাথা মাথাটা ঘুরিয়ে রেখেছে।রবিনের কলিজায় আঘাত লাগলো লাশের মুখের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে লিপির এমন অবস্থা দেখে।বাসায় আসলে দুলাভাই দুলাভাই বলে পাগল হয়ে যেতো।রবিনও ছোট বোনের মতো ভালোবাসতো।সেই মেয়েটার এমন করুন মৃত্যু রবিনকে খুব কষ্ট দেয়।পরক্ষনেই কি ভেবে চোয়াল ফুলায় রবিন।রণ কে ডেকে বাইরের ভীর কমাতে বলে।রণ ৪জন হাবিলদারকে দিয়ে ভীর সরিয়ে পাহাড়া বসায় বাড়ির বাইরে।যদিও আাশেপাশের লোকগুলো যথেষ্ট কানাঘুষা করে এদিকে ফিরেই।
মাহিদা আন্টি লিপির এ অবস্থা দেখে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন।রণ ডক্টরকে ডেকে আনিয়েছিলো। মাহিদা আন্টিকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।একজন সাহসী মহিলা কি করে এতো ভেঙে পড়তে পারে সেটাই রণ ভাবে।সাহসী ও নির্ভীক দাপুটে ম্যাজিস্ট্রেট ছিল মাহিদা চৌধুরী অথচ মেহেরকে হারিয়ে যেন তার সমস্ত শক্তি দাপট সব হারিয়ে গিয়েছে। রণর ভাবনায় ছেদ পড়ে বুড়ির নাতনীকে নিঃশব্দে পেছনে দাঁড়ানো দেখে।সামনের আয়নায় স্পষ্ট দেখতে পায়। মেয়েটাকে দেখতে অবিকল যেন মাহিদা চৌধুরীর মতো। চোখ ছলছল করছে যেন একটু কিছুর নাড়াতেই চোখ দিয়ে পানির জল উছলে বন্যার সৃষ্টি হবে সমস্ত মুখজুড়ে।রণ কিছু একটা আন্দাজ করে রুম থেকে বের হয়ে গেলো।বের হয়ে গেলো এমন না বাইরে দাড়িয়ে কান পেতে রইলো কিছু শোনার আশায়।কিন্তু অনেক্ষণ হয়ে গেলেও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রণ দরজায় উঁকি দিলো।যা দেখলো তাতে রণ খুশিই হলো।মেয়েটি মাহিদা আন্টির কপালে চুমু দিয়ে মাথায় হাত বুলাচ্ছে শিওরে মাথা রেখে।রণর বুঝতে বাকি নেয় এই হলো মাহিদা আন্টির মেয়ে রিমাসা।কিন্তু বুঝতে যেটা বাকি রইলো সেটা হলো এতোবছর পর আজ হঠাৎ কি করে? আর এই বুড়ি ওকে নিজের নাতনী কেন বললো? ভাবতে ভাবতে পেছনে ঘুরতেই দেখে নিচে খুব গম্ভীরমুখে রবিন বসে আছে।করিডোর ধরে দাড়িয়ে নিচে নামতেই যাবে তখনি একটা বিষয় নজরে পড়লো।মেহের! হ্যাঁ মেহের।কি অদ্ভুত করে দাঁত খিচিয়ে রবিনের দিকে তাকিয়ে আছে।যেন রবিন ওর চিরশত্রু। রণ নিচে নামলো না উপরে এমনভাবে দাড়িয়ে রইলো যেন কারো চোখ না পড়ে ওর দিকে কিন্তু ও সবাইকে দেখতে পারবে।
রবিন লিপির লাশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো।কপালের ভাঁজটা রবিনের বেড়েই যাচ্ছে। যেন রহস্যের পর রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে।
রবিন তোর সাথে আমার জরুরি কথা আছে।
হুম।লিপির লাশের জানাজার ব্যবস্থা করতে হবে রণ।মূর্দাকে বেশিক্ষণ এভাবে রাখা যাবে না।
কিন্তু আমি যা বলছিলাম
পরে শুনবো। আগে এই কাজটা শেষ করি চল
আচ্ছা!
লাশের দাফন সম্পন্ন করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে আসলো।পুরো মহল্লায় থমথমে পরিবেশ। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিভৎস মৃত্যুর ঘটনা হয়তো আগে ঘটেনি এই মহল্লায়।
মাহিদা আন্টির জা এসে খাবার দিয়ে গেছেন।রবিন শান্ত ভঙ্গিতে খাবারগুলো প্লেটে প্লেটে বাড়ছে।রণ এদিক ওদিক তাকিয়ে বসার ঘরে কাওকে না দেখে আবারও রবিনের কাছে গিয়ে কিছু বলতে গেলো।বরাবরের মতো এবারও রবিন রণকে অগ্রাহ্য করলো।রবিনের অগ্রাহ্যের ভাব দেখে মেজাজ চড়ে গেলো রণর তবুও শান্ত রইলো।
খিচুরী আর ডিমভাজি সাথে বেগুন গোল গোল করে ভাজা এই হলো আজ রাতের ডিনার।সবার যেহেতু মন খারাপ কেউ খাবে কিনা রণ বুঝতে পারে না।রণর নিজেরও খেতে ইচ্ছা করে না।
রবিন নির্বিকার ভঙ্গিতে টেবিল মুছে খাবার প্লেটে খাবার সাজিয়ে রাখলো।রণ ভালো করে দেখতেই খেয়াল করলো রবিন মাত্র তিন প্লেট খাবার বেড়েছে কিন্তু বাসায় মানুষ ৬ জন।এছাড়াও বাকি যেদুজন কাজের লোক ছিল রবিন তাদের মেহেরের কাকির বাসায় শুতে বলেছে কারন ওরা ভয়ে ছিল লিপির মৃত্যু নিয়ে।
কিরে তুই তো তিন প্লেট বাড়লি কিন্তু মানুষ তো ৬ জন।
তুই কি খাবি? নে খা তাহলে
রণর মুখের সামনে রবিন প্লেটটা এমনভাবে ধরলো রণ আৎকে উঠলো একপ্রকার।
পাগল হয়ে গেছিস? আমি খাবো কেন?
তাহলে বকবক কম কর।
রবিন বেশি হয়ে যাচ্ছে শালা! তখন থেকে দেখছি কেমন কেমন ব্যবহার করছিস? হয়েছে কি তোর?
হুশশশ! আর কথা হবে না। আমাকে বিশ্বাস করিস তুই? ভরসা আছে আমার উপর তোর রণ?
হুম।
তাহলে শুধু চুপচাপ দেখে যা।
আচ্ছা! রণ ভ্যাবলার মতো কিছু না বুঝেই মাথা নাড়াল।
যা মেহের আর ঐ বুড়ি মা ও উনার নাতনীকে ডেকে আন।
আমি?
আর কেউ কি আছে এখানে?
না!
তাহলে যা!
আচ্ছা! রণ দুপা গিয়ে আবার রবিনের দিকে ঘুরে তাকায়।রবিন চোখের ইশারায় ডাকতে যেতে বলে।
রণ মেহেরের দরজায় গিয়ে আগে নক করে।মেহেরের ঘরে যাওয়ার আগে আন্টিকেও একবার দেখে যায়।আন্টি ঘুমাচ্ছিল।
মেহেরের দরজায় কয়েকবার নক করার পরও যখন দরজা খুললো না দেখে মন খারাপ করে বুড়িকে না ডেকেই ফিরে চলে আসে।এসে দেখে মেহের টেবিলে বসে গ্রোগাসে মাংস খাচ্ছে ।কিন্তু মাংস কই পেলো মেহের?
বুড়িও চটকে চটকে ফোকলা মুখে খাচ্ছে মাংস।শুধু রিমাসায় চুপ করে বসে আছে মাথা নিচু করে।
রণ রবিনের গা ঘেষে দাড়িয়ে ওদের খাওয়া দেখে নাক কুঁচকায়।
মাংস তো সাবিনা আন্টি দেয় নি তাহলে মাংস কই পেলি?
মানুষ কেটে রান্না করেছি।
কি! রণ সশব্দে বলে ওঠায় খাবার টেবিলের সবাই প্রশ্নাতুর করে তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে
কি হয়েছে?
কিছু না।তোমরা খাও।মেহেরের প্রশ্নের জবাব দেয় রবিন।
রণ চুপ করে থাকে মেহেরের রক্তচক্ষে তাকানো দেখে।
খাওয়া শেষ করে সবাই হাত ধুয়েছে এমন সময় সদর দরজায় নক পরে।
যা খুলে দিয়ে আয়!
রণ রবিনের কথায় বিরক্ত নিয়ে চুপচাপ গিয়ে দরজা খোলে।খুলেই দেখে সামনে মাওলানা চাচা দাড়িয়ে আছে মুখে চিরচেনা হাসি নিয়ে।
চাচাকে দেখেই সালাম দেয় রণ।চাচাও সালামের উত্তর দেয় পরম আদরে।
মাওলানা আবদুর রহমান রনর আপন চাচা।বড় এলেম লোক মাওলানা চাচা।চাচাকে খুব একটা সময় কাছে পাওয়া যায় না কারন চাচাজান বড়ই ভবঘুরে মানুষ। চাচীজান মরার পর একমাত্র মেয়ে রহিমার বিয়ে দিয়ে এখন ভবঘুরে হয়েছেন।মাঝেসাঝে আসেন মেয়ের সুখদুঃখের খোজ নিতে।আবার হাওয়া হয়ে যান।আজ হঠাৎ এখানে উদয় হলেন কেন?
কি আব্বাজান! ভেতরে ডাকবা না
ওহ! মাফ করবেন চাচাজান।একটু অন্যমস্ক হয়ে গিয়েছিলাম
মাফ করার মালিক তো আল্লাহ। আমি তার তুচ্ছ বান্দা।
জ্বী! আসেন ভেতরে।
চাচাজান! আমরা সবাই তো তুচ্ছ বান্দা রবের। তবুও কেউ মাফ চাইলে তো ক্ষমা করার অধিকার রাখি তাইনা?
হুম।তবে আব্বাজান আমি নিজের দোষেই দুষ্ট মানুষ।অন্যের দোষ দেখবো কোন চোখে।তবুও ভুল ত্রুটি দেখলে সামর্থ্য মতো বুঝিয়ে বলি।
আপনার কথা শুনলে কলিজা শীতল হয় চাচাজান।আপনি অনেক ভালো চাচাজান।
সব দেখার নজর আব্বা।আর ঐ মহিমাময়ের কৃপা আমার উপর।তিনি ছাড়া আমি কিছুই না।আমার ভেতর যা ভালো দেখো আলহামদুলিল্লাহ তা সব তার দান।
বসেন চাচাজান।
হুম।বাড়িটা ঘুরে ঘুরে তাকিয়ে দেখে মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে বসে রইলেন আবদুর রহমান চাচা।
রণ চাচাকে বসিয়ে খাবার ঘরে গিয়ে রবিনকে খবরটা দিলো কানে কানে।রণ ভেবেছিল রবিন মাওলানা চাচার আসার কথা শুনে অবাক হবে কিন্তু না হলো না অবাক।
খাবার সেড়ে সবাই যখন বসার রুমে উপস্থিত হলো তখন হঠাৎই বুড়ি হুঙ্কার ছেড়ে উঠলো।
এই! এই মিনসে টা এখানে ক্যান আইছে?
কেন খুশি হও নাই আমার আসাতে তুমি সফুরন? বুড়িকে দেখে আবদুর রহমান হেসে উঠে দাঁড়ালো।
রিম যা পুটলি নিয়া আই এই বাড়িত আর থাকুম না।তড়তড়ি যা।
রিমাসা কে দাড়িয়ে থাকতে দেখে বুড়ি খেপে রিমাসার ঘার ধরে ধাক্কা দেয়।বুড়ির ধাক্কাতে রিমাসা নিচে পড়ে যায়।
ছেরি!ঘাওরা কেন তুই? সবসময়ই ত্যাড়ামি করস!যাইতে কইলাম যা।
আম্মাজান ওঠেন আপনি।আসেন বসেন।চাচাজান কান্নারত রিমাসাকে উঠিয়ে নিয়ে সোফায় বসিয়ে দেয়।
ছোটমিয়া! কামডা কইলাম ভালা করতাছো না। আমার কামে ব্যাঘাত করবা তো তোমার বউয়ের লাহান মাইয়াডারেও কবরে পাডাই দিমু।বুড়ি রেগে বলতে থাকে।
সব আল্লাহর উপর ছেড়ে দিছি আমি।তাকে ছাড়া অন্য কাওকে আমি ভয় পাইনা।তিনিই সঠিক বিচারকারী।পাপ করে কেউ পার পাবে না। হোক ইহকাল কি পরকাল।
বড় কইলজা তোর ছোটমিয়া বড় কইলজা।আমারে পাপপূন্য শিখাইবার আসোছ!তোর আল্লাহ দেহি এইবার তোরে কেমনে বাঁচাই আমার হাত থেইকা।ঐ মেহের!
মেহেরের নাম নিতেই মেহের বাঘের মতো গোঙাতে লাগলো।যেন মনুষ্যরূপি কোনো বাঘিনী।
চলবে,,,,