Socialize

অমাবস্যার চাঁদ পর্ব ২

অমাবস্যার চাঁদ
পর্ব ২
writer Tanishq Sheikh Tani
রনি আমার কিন্তু খুব ভয় করছে রে? চল এখনি চলে যায় এখান থেকে।
আমিও তাই ভাবছি।মেহেরের লাশ গেল কোথায় এটাই তো মাথায় আসছে না।সব তোর দোষ শালা! মেহেরকে দেখে তোর মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কি দরকার ছিল ওর সাথে জোর করার?
ওহ! এখন সব দোষ আমার। আর তুই যে ওর সাথে মজা নিলি সেটা কিছুই না। আমি যদি দোষ করি তুমিও ধোঁয়া তুলসী পাতা না।ফ্রি তে শালা মজা খাবা আবার সময় বুঝে পাল্টি মারো।বিপদ দেখলেই সাধু সাজা তাই না? শালা হিজরা একটা।
কি! তোর এতো সাহস তুই আমাকে হিজরা বলিস? মারুফ রেগে রনিকে ঘুষি বসিয়ে দেয়।রনিও মারুফের কলার চেপে ধরে মারতে উদ্যোত হয়।
সাহির এতোক্ষন বসে বসে মেহেরের লাশ গায়েব হওয়া নিয়ে চিন্তিত ছিল।ভেবেই কূলকিনারা পাচ্ছে না বিষয়টার। এর মধ্যে দুবন্ধুর এমন ইদুর বেড়াল লড়াই মোটেও সহ্য করার মতো না।সোফা ছেড়ে উঠে দুবন্ধুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে চিৎকার করে ওঠে।
হোয়াটস রং উইথ ইউ ম্যান! এমন একটা মুহুর্তে কোথায় পরস্পরকে সাহায্য করবো মাথা ঠান্ডা করে তা না উল্টো কুকুরের মতো লড়াই করে যাচ্ছিস।
আমাকে কেন বলছিস? এই ব্যাটা রনিকে বল?
জাস্ট সাট আপ মারুফ! আর একটা কথা হবে না এ নিয়ে।নয়তো তোদের দুজনকেও মেহেরের মতো হতে হবে। সাহির প্রচন্ড ক্ষিপ্র হয়ে ওঠে।
রনি মারুফ ভয়ে চুপ মেরে যায়।রনি এগিয়ে এসে দুজনকে সরি বলে।এবং এ থেকে মুক্তির জন্য কোনো উপায় বের করতে বলে তাড়াতাড়ি।
হুমম! তবে তার জন্য সময় লাগবে।কারন এখন ভর দুপুর হয়ে গিয়েছে।রাত ছাড়া কিছু করা সম্ভব না।
রাআআত,,,মারুফ রনি ভয়ে সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে
ডোন্ট সাউট ব্লাডি কাওয়ার্ডের দল।রাত ছাড়া দিনে কি করে খুজবি ওকে।এটা যেহেতু পাহাড়ি প্রত্যন্ত এলাকা এখানে আধার নামার সাথে সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নেবে।বাইরে খুব একটা কেউ বেরোবে না। কারন এরা নানা অপদেবের কুসংস্কারে বিশ্বাসী।রাতকে এরা ভয় পায়।আর আজ যেহেতু অমাবস্যা আজ তো তাড়াতাড়ি সবাই ঘুমিয়ে পড়বে।সো আমাদের কাজ ও ইজি হয়ে যাবে।
সাহির!বলছিলাম কি আজ না গেলে হয় না রাতে? মারুফ ভয়ে ভয়ে বলে
পাগল হয়েছিস? আজ যে করেই হোক লাশ খুজে বের করতে হবে। আমরা তিনজন খাদের নিচে গিয়ে ভালো করে খুঁজলেই হয়তো পেয়ে যাবো।আমার ধারনা ওর লাশ নিচেই পড়ে গিয়েছে।তারপর আর কোনো ঝামেলা নাই।
সাহির ভেবে দ্যাখ দোস্ত আজ অমাবস্যা।মারুফ আবারও বলে
তো?তাতে কি?
অমাবস্যায় পৃথিবীর যতো দুষ্ট শক্তি সব জেগে ওঠে।দোস্ত রিস্ক না নিলে হয় না।পাহাড়ি এলাকা বলেই ভয় টা আমার বেশি রে।কারন এখানের নির্জন জঙ্গলে শতবছরের পুরানো পেত পিশাচের আস্তানা আছে।
ওহ! রিয়েলি? আমি তো ভয় ই পেয়ে গিয়েছি রে।ও মাই গড!ও মাই গড।শালা তোর এসব গাঁজাখুরি গল্প তুই অন্য কাওকে শুনাস।আমার সামনে নেক্সট টাইম এসব কাহিনি বলবি না।আমি এসব অপশক্তি ভূত প্রেতে বিশ্বাসী না।
মারুফ কিছু বলতে চাইলেও সাহির আর রনি র চোখ রাঙানিতে তা বলে ওঠা হয় না।তিনজনে মিলে প্লান করতে থাকে রাতের জন্য।
মাহিদা চৌধুরী গত দুদিন ধরে মেহেরকে কল করেও পাচ্ছে না।চিন্তায় বিছানায় পড়ার মতো অবস্থা।পুত্রতূল্য ভাতিজা রবিনকে খবর দিয়ে বনানী থেকে নিয়ে আসা হয়।রবিন পেশায় একজন ডিডেক্টিভ। সারাক্ষণ বই আর মাথা ভর্তি চিন্তা নিয়ে বসে থাকে।খালার মোবাইল পেয়ে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে মিরপুর চলে আসে।খালার দুঃশ্চিতা দূর করার সাথে সাথে রহস্যের গন্ধ পেয়েই রবিনের যাওয়ার আগ্রহ টা দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
দরজায় নক পড়তেই মাহিদা চৌধুরী চশমাটা ঠিক করে সেদিকে তাকায়।রবিনকে দেখে কি এক আবেগ আর ভরসায় বাচ্চাদের মতো করে কেঁদে ওঠে মাহিদা চৌধুরী।
আন্টি কি হয়েছে তোমার? এই অবস্থা কেন? আর মেহু কই?
রবিন! আমার মেহুকে আমি গত দুদিন ধরে পাচ্ছি না রে।ওর মোবাইলটাও সুইচ অফ।
আমার মেয়েটাকে খুঁজে দে বাবা।
খালা তুমি একদমই কাঁদবে না।আমি আছি কি জন্য? আমি দেখছি বিষয়টা।তুমি শান্ত হও।
মাহিদা রবিনের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে।স্বামীর মৃত্যুর পর এই মেয়েই তো আছে মাহিদা চৌধুরীর জীবনে।মেয়েকে পৃথিবীর সকল অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মেহেরের কাছে মায়ের এই উৎকন্ঠা, ভালোবাসা সব কৈফিয়ত লাগে।সকল বিষয়ে মায়ের হস্তক্ষেপ ইদানিং সহ্যই করতে পারে না মেহের অথচ তিন বছর আগেও ভদ্র নম্র মেধাবী একটা মেয়ে ছিল।মায়ের সকল কথা খুশি মনে মেনে নিতো হঠাৎ করেই পাল্টে যেতে লাগলো।রাত করে বাড়ি ফেরা কিছু জিজ্ঞাসা করলে ভাঙচুর করা এসব যেন তার অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেল। আদরের মেয়েকে বোঝানো ছাড়া আর কোনো উপায় দেখে না মাহিদা।কিন্তু শেষরক্ষা বুঝি আর হলো না।ডুকরে কেঁদে ওঠে মাহিদা চৌধুরী। মন টা কু ডাকছে সকাল থেকে।কোথায় আছে কেমন আছে মেয়েটা এই চিন্তায় মাথা ধরে আসছে।
রবিন খালা ও চাকর বাকরের সাথে কথা বলে কিছু একটা আন্দাজ করে আসছি বলে কোথায় যেন বেরিয়ে পড়ে।
মৃত্যু আগমুহূর্ত মানুষের যেমন টান ওঠে ঠিক তেমন টান উঠছে মেহেরের।বিস্ফোরিত চোখে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে প্যারালাইসিস রোগীর মতো সোজা হয়ে শুয়ে আছে। চোখ ছাড়া আর কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নাড়াতে পারে না মেহের।শব্দ করে করে নিঃশ্বাস পড়ছে। নিজের শ্বাস প্রশ্বাস ই বিকট শব্দ হয় কানে লাগছে।এতোটা অসহায় কোনোদিন জীবনে ফিল হয়নি মেহেরের।মায়ের কথা কেন শুনলো না? কেন মায়ের আঁচলে লুকিয়ে না থেকে পৃথিবীর আনন্দ শোষণ করে মুক্ত বিহঙ্গী হতে চাইলো?এই অনুশোচনা আরও শেষ করে দিচ্ছে। দৈহিক মানসিক সকল বল শক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে।
চারিদিকে চোখনাড়িয়ে নিজের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছে মেহের।কে আসন্নমৃত্যু থেকে বাঁচিয়ে এই নোংরা শ্যাওলাপড়া ঘরটাতে নিয়ে আসলো? এই ভাবনায় মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে যেই আনুক তার কাছে কৃতজ্ঞ মেহের।মায়ের কাছে যেতে পারলেই এখন খুশি আর কিছুই চাইনা মেহেরের।চোখ ভিজে আসে মমতাময়ী মাকে মনে করে।
ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদকরে হঠাৎ একটা স্যাঁতস্যাতে কাদা মাটির গন্ধ এসে নাকে লাগলো।চারিদিকে ইদুরের খ্যাচখ্যাচানি হঠাৎই বেড়ে গেলো।এতে করে ইদুরের বৃষ্ঠার গন্ধও উৎকট হয়ে আসছে।পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ পরিবেশ মনে হয় এটাই হবে মেহেরের মনে হয়।এখন যদি হাত দিয়ে নাকটা ধরা যেত তবে বড় বাঁচা বাচতো মেহের। কিন্তু দূর্ভাগ্য আজ আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে মেহেরকে।
হঠাৎ খট করে দরজা খোলার শব্দ পেল মেহের।আড়চোখ করে দেখার চেষ্টা করলো কে।মাটির তীব্র স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ টা ক্রমশ কাছে আসছে বলে মনে হচ্ছে মেহেরের।
সু স্বাগতম বন্ধু! তোমাকে আমার আতিথয়তা গ্রহণ করার জন্য কৃতজ্ঞতা।
ফোকলা দাতে বয়োবৃদ্ধ মেয়েমানুষ যেভাবে কথা বলে মেহেরের কাছে ঠিক তেমনটিই লাগে মহিলারটার কথা।মেহের চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই ভয়ে নিঃশ্বাসের গতি বেড়ে যায়।কন্ঠস্বর সচল থাকলে অবশ্যই মেহের গগনবিহারী চিৎকার করতো এই মহিলাকে দেখলে।পাকা পাতলা চুলে কুঁজো লাঠি হাতে বিশ্রী ভয়ংকর চেহারার কুঁজো বুড়িটা মেহেরকে দেখে বিদঘুটে হাসি হাসে।সাথের কালো বেড়ালটাও ভয়ংকর দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে মেহেরের দিকে।
আজ আমি বড় খুশি! বড় খুশি আমি প্রভু। তুমি আমায় আজ আমার সাধনার ফল দিয়েছো।এতোসুন্দর দেহ,সুন্দর মুখশ্রী সব আমার কন্যার হবে। আমার কন্যা আবার এই দুনিয়াতে ফিরবে। আবার ফিরবে আমার রিম।হাত উচিয়ে বিকট শব্দে বুড়ি বলতে থাকে।বেড়ালটাও ম্যাঁও ম্যাও করে অদ্ভুত আওয়াজ করে।
এই মেয়ে! আমি জানি তুই প্রতিশোধ চাস তাই না?
মেহের ছলছল চোখে বুড়ির দিকে তাকায়।বুড়ি যেন মেহেরের আকুতি বুঝতে পারে।
আমি তোকে সাহায্য করবো।তোর সাথে অন্যায়ের সকল বিচার করবো।তবে তার জন্য তোর দেহ আমার চাই।করবি আদান প্রদান?
মেহের বুড়ির হাসির অর্থ বুঝতে পারে এবার।মৃত্যু থেকে বেচে নতুন মৃত্যুকূপে এসে পৌঁছেছে মেহের।চোখের জলে বুড়ির কাছে বাঁচার আকুতি জানায় কিন্তু বুড়ি কোন কথায় শোনে না।পাশের কফিন খোলে বুড়ি।মেহের চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখে এক কঙ্কালকে মখমলের কাপড়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে।মেহেরের ভয়ে বুক কাঁপে। বুঝতে পারে শেষ সময় আসন্ন তার।মৃত্যুর পূর্বে মায়ের জন্য চোখ ভিজে আসে। লাশটাও মা পাবে না। কি নিষ্ঠুরতা হায়ঃ
বুড়ি শান দেওয়া বড় রামদা এনে পৈশাচিক হাসি হাসতে হাসতে চোখ বন্ধ করে কি সব বিরবির করতে থাকে।পুরো জায়গাটায় ধোঁয়া উঠতে থাকে।চোখ খুলে শা করে দা টা মেহেরের হৃদপিণ্ড বরাবর বসিয়ে দেয় বুড়ি।মেহেরের দেহটা অসহ্য যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে একসময় থেমে যায়।চোখের জলের ধারা এখনও বইছে মেহেরের নেত্র থেকে।
চলবে,,,,