Socialize

অমাবস্যার চাঁদ পর্ব ৩

অমাবস্যার চাঁদ
পর্ব ০৩
writer Tanishq Sheikh Tani
মারুফ সাহির লাইট মেরে অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। রনি হাতে লাঠি ছুড়ি নিয়ে ভয়ে ভয়ে ওদের পিছে এগিয়ে চলছে।
পাহাড়ের এই নিচু খাদমতো জায়গাটা আসলে একটা জঙ্গল।ঘন জঙ্গল যাকে বলে।একেতো গাছগাছড়ায় ঘেরা শুনশান তারউপর অমাবস্যার ঘুটঘুটে রাত।নিজেদের পা ফেলার শব্দটাই ভয়ংকর লাগছে।সাহির নির্ভীক ভাবে পথ চলছে তা কিন্তু মোটেও না।যথেষ্ট ভয় কাজ করছে ওর মনেও রনি এবং মারুফের মতো। কিন্তু সব ভয় ডর উপেক্ষা করে এখানে এসেছে শুধুমাত্র মেহেরের লাশের জন্য। কারও হাতে লাশ পড়া মানেই চৌদ্দশিকে যাওয়া।যার জন্য মোটেও প্রস্তুত নয় সাহির।মাত্র তো জীবন শুরু।এই আনন্দ উপভোগের সময়টুকু জেলে পঁচে নষ্ট করে দেওয়ার মতো বোকামি করা ঠিক না।কিন্তু মেহেরের জন্য ফেঁসেই গেলো মনে হচ্ছে।
রনিইইই,,,,,রনি,,,এই রনি,,,হিহিহি
রনির কানের পাশ দিয়ে শো করে দমকা হাওয়ার মতো কিছু ছুটে গেলো নাম ধরে।মেয়েলি কন্ঠস্বরের গা হিম করা হাসি।
এই,,,এ,,,এই সাহিরর! রনি দাড়িয়ে ভয়ে চঞ্চল চোখে এদিক ওদিক ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলে
মারুফ সাহির রনির ডাক শুনে বিরক্ত নিয়ে পেছনে তাকাতেই যা দেখলো তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না দুজন।রনির ঠিক মাথার উপরের ডালটায় পা মেলে চুল এলিয়ে রক্তাক্ত শরীরে বসে পা দুলাচ্ছে মেহের।গায়ে আল্লাখেল্লা মতো কালো জামা পড়া।কি বিদঘুটে হাসি মেহেরের।গায়ে কাটা দিয়ে ওঠে সাহির আর মারুফের।চিরচেনা মেহেরের হাসির আর এই হাসির মধ্যে অনেক অমিল।
রনি সাহির ও মারুফের চাহনি অনুসরণ করে উপরে তাকাতে ঘার বেঁকিয়ে দাঁত খিচে রনির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মেহের।সাহির মারুফ ভয়ে আরও দুপা পিছিয়ে যায়। রনি আপ্রাণ চেষ্টা করেও মেহেরকে নিজের বুকের উপর থেকে সরাতে পারে না।মেহের পায়ে নিচে থাকা রনির দিকে লোভাতুর সম্মোহনের দৃষ্টিতে তাকায়।সে নজর দেখেই রনির কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়।মেহের আস্তে করে রনির বুক থেকে নেমে ভাঙা ভাঙা পায়ে সামনে এগোতে থাকে। সাহির মারুফ অবাক হয়ে দেখে রনি মেহেরের পথ অনুসরণ করে হেঁটে চলছে দুজন রনিকে থামানোর চেষ্টা করেও পারে না।ওরাও রনির পেছন পেছন এগোতে থাকে।রাতে পূর্নিমার চাঁদ যতোটা সুন্দর হয় অমাবস্যার চাঁদ তার চেয়েও যে ভয়ংকর হয় তা আজকের চাঁদ না দেখলে বোঝার উপায় ছিল না সাহিরের।গা হিম হয়ে আসছে তবুও এগিয়ে যাচ্ছে কোন আশায় জানা নেই।শুধু জানে সামনে এগোতে হবে খুব সামনে। মাথার উপরের কালো চাঁদটাকে দেখে সাহিরের মনে হচ্ছে অমাবস্যার চাঁদটাও বুঝি ওদের পিছু নিয়েছে
গভীর রাত অব্দি নানা ভাবনায় কাটে রবিনের।পয়েন্টে পয়েন্টে মেলানোর চেষ্টা করছে মেহের নিখোঁজের ক্লুগুলোকে।কোনোমতেই ক্লু গুলোকে এক করা যাচ্ছে না।
আসবো!
আরে রণ! Come here
অনেক তো রাত হলো এবার তো ঘুমা।ব্রেনে এতো লোড নিলে পরে তো গোয়েন্দাগিরি করতে পারবি না ব্যাটা।এই বুঝি মেহের মিসিংয়ের ক্লু?
রণ আর কিছু না বলে ক্লু গুলো খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকে।রণ রবিন রুমমেট, বেস্ট ফ্রেন্ড।রণ পেশায় সাব ইনস্পেক্টর দুজন একসাথে হয়েই রহস্যের জাল ছিন্ন করে দিনের আলোতে নিয়ে আসে।একে অপরের রহস্যভেদের সাথি।
বাহ! লক্ষ্য তো প্রায় কাছাকাছি। এবার মনে হয় তাড়াতাড়িই রহস্য ভেদ হবে কি বলিস রবিন?
দেখতে যেটা সহজ মনে হয় আদতে সেটাই দুর্বোধ্য এবং বন্ধুর বুঝলি।
হুমম।এখন আমাকে সব বল।তারপর দেখছি আমিও ক্লু মিলিয়ে।
হুমম।রবিন এক এক করে বলা শুরু করলো
ব্যবসায়ী সাহির খান নব্য বিবাহিত। ঘরে সুন্দরী নতুন বউ। ৫ দিন আগে ব্যবসায়ের কাজে রাঙামাটি গিয়েছে। মেহের নামী ম্যাজিস্ট্রেট মাহিদা চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে।একমাত্র বললে ভুল হবে কারন মাহিদা চৌধুরীর আরো এক মেয়ে ছিল যে কিনা ১০ বছর আগেই নিখোঁজ।স্বামী মৃত রাশেদ চৌধুরী। মেহেরকে আমি পার্সোনালি ভালোয় চিনি জানি।মেয়েটা ভালো তবে আজ ওর বন্ধু বা কাছের মানুষদের কাছ থেকে যা জানলাম তাতে ওর নামের পাশে ভালো শব্দটা এখন ততটো উপযুক্ত মনে হয় না।
আচ্ছা বুঝলাম কিন্তু সাহির খানকে কেন তুই সন্দেহ করছিস? সাহির খান তো মেহেরদের চেনাজানার কেউ না।
কে বলেছে চেনাজানা কেউ না।গভীর চেনাজানা মেহের আর সাহিরের।
কি ভাবে? রণ নড়েচড়ে বসলো।
মেহেরের কাজিন হৃদিতার বয়ফ্রেন্ড ছিল সাহির।
তো?
হৃদিতার সাথে সাহিরের সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার মূলে ছিল মেহের।মেহেরকে দেখার পরই হৃদিতার সাথে সম্পর্ক ব্রেকাপ হয়ে যায় সাহিরের।কলেজে গিয়ে যখন হৃদিতাকে প্রশ্ন করলাম সহজে বলতে নারাজ ছিল পরে যা একটু বলেছিলো তাতে আমার সন্দেহ আরো বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু মেয়েটা আমাকে সম্পূর্ণ সত্য বলে নি।পরে ওর অন্য এক ফ্রেন্ডসের থেকে জেনেছি সাহিরের সাথে নাকি মেহেরকে হৃদিতা ঘনিষ্ঠভাবে দেখে ফেলে।এ নিয়ে কলেজে তুলকালাম পরিবেশ সৃষ্টি করে হৃদিতা আর মেহের।পরে কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপে ঘটনাটা গোপনে মিমাংসা করা হয়।
এর পর থেকে হৃদিতা আর মেহেরের সাপে নেওলে সম্পর্ক।
তাহলে কি ধরে নিবো মেহেরের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে হৃদিতার হাত আছে?
একদমই না।
তবে কার দিকে তোর সন্দেহের আঙুল।
সাহির খানের দিকে।কারন সাহির খান এখন রাঙামাটি আর আমি মেহেরের ফোন কলের লাস্ট লোকেশনও রাঙামাটি পেয়েছি। সো বুঝতেই পারছিস আসল কাহিনি কি?
হুমম।তাহলে আর কি? রহস্য ভেদ তো হয়েই গেলো।তাহলে কাল গিয়েই এরেস্ট করি ওদেরকে।এভাবে হয়রানি করার জন্য একটা চার্জশিট তো বানাতেই হয় কি বলিস?
এরেস্ট ওয়ারেন্ট আছে তোর কাছে রণ? কিসের ভিত্তিতে এরেস্ট করতে চাস? শ্রেফ সন্দেহের কারনে? এমন করলে সাহির খান না আবার তোর পোস্টিং বান্দরবানে করিয়ে দেয়।
আরে! ওভার এক্সাইটমেইন্টে সব গুলে ফেলেছি। কথা তো ঠিকই বলেছিস?তাহলে কি করবি? রাঙামাটি যাওয়ার প্লান করছিস নাকি?
হুমম।ভাবছি কাল সকালেই রওনা দেবো।তুই কি যাবি?
ভাই সরকারি চাকরি করি।তোমার মতো স্বাধীনতা নেই আমার।ছুটিছাটার জন্য এপ্লাই করতে হবে তো আগে।কাল পারবো না যেতে।পরশু কি তরশু আমি রাঙামাটি পৌঁছে যাবো।আর তার আগেই যদি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায় তা হলে তো আলহামদুলিল্লাহ।
হুমম।আচ্ছা যা ঘুমিয়ে পড়।
তুই ঘুমাবি না।
তাহাজ্জুদ পড়ে কোরআন তিলাওয়াতের পর ফজর নামাজ শেষ করে যদি পারি ২/১ ঘন্টা ঘুমাবো।
তা বেশ!সব ছাড়া যাবে নামাজ না।আমিও ওযু করে আসছি।একটা কথা বলি রবিন?
বল!
শালা আমরা আজ পর্যন্ত একটা মেয়ে পটাতে পারলাম না আর এই সাহির বউ থাকতেও সুন্দরী গফ কেমনে পটাইলো রে।তাও আবার গন্ডায় গন্ডায়।
যোগ্যতা লাগে মাই বয়! এসব হারাম কাজ কি আর আমাদের মতো মানুষ দ্বারা সম্ভব? এগুলো হলো মাল্টি ন্যাস্টি টেলেন্ট। তোমার আমার পাক ব্রেনে এসব ঢুকবে না।
ঠিক বলছিস দোস্ত!কবে যে আমিও বিয়া করুম।তোর হাতের পোড়া তরকারি খেয়ে পেটের ১৩ টা বেজে গেছে।
নামাজে বসবো মিথ্যে বলিস না শুধু শুধু
সরি! রণ জিহ্বায় কামড় দিয়ে হেসে অযুর জন্য দৌড় দেয়।
নামাজ পড়ে ২ ঘন্টা ঘুমিয়ে ছিল রবিন।বিছানা ছেড়ে উঠে জানালা দিয়ে আকাশে দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞ চিত্তে আলহামদুলিল্লাহ বলে। আরো একটা নতুন দিন উপহার দেওয়ার জন্য। মৃত্যু অনিবার্য তবে যতদিন হায়াত আছে যে কাজের জন্য পাঠিয়েছেন আল্লাহ পাক সে কাজটায় করে যাওয়া উচিত সর্বোচ্চ চেষ্টায় আর তা হলো রাব্বুল আলামীনের ইবাদত। সাথে তার সৃষ্টির সেবা।রাস্তায় পড়ে থাকা কস্টদায়ক কাটাও যদি সরানো যায় তাতেই পূন্য।আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লার কৃপায় যদি তার বান্দার সামান্য কষ্টও লাগব করতে পারি তাতেই আমার তৃপ্তি।আমার রব খুশি তো আমি খুশি।
মেসওয়াক করে চায়ের জন্য পানি চড়িয়ে গোসল করতে ঢুকে যায়।গোসল সেড়ে মাথা মুছতে মুছতে চা পাতা দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চা কাপে ঢেলে সোফায় বসে পড়ে।বিসমিল্লাহ বলে চা খেতে খেতে খবরের কাগজ টা উল্টাতেই কাপটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে রাখে।
রণ! রণ! এই রণ।রবিন জোরে জোরে রণ করে ডাকে।
রণ ঘুম ঘুম চোখে ঢুলতে ঢুলতে এসে রবিনের পাশে বসে।
হুমম।বল
আরে এদিকে একবার দ্যাখ তো?
কেন আবার কার কি হয়েছে? শালা এই দেশে পেপার পত্রিকাগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত।একটা ভালো খবর যদি ছাপে ৯৯ টাই খারাপ খবর।খবর শুনলেই মন খারাপ হয়ে যায়।শুধু শুধু ১০ টাকা জলে যায়।
আরে বকবক বন্ধ করে এই খবর টা শোন।
বল শুনছি।সোফায় চোখ বন্ধ করে জিম ধরে বসে বসে রণ।
রাঙামাটিতে তিনজন ব্যবসায়ীর মস্তকহীন ৩ টুকরো লাশ পেয়েছে স্থানীয় পুলিশ।গতরাতে মেইনরোডের পাশে পড়ে ছিল লাশ তিনটা।লাশ তিনটার লিঙ্গ কেউ কেটে নিয়েছে সাথে বুক চিরে কলিজা তিনটাও।
ছি! কি উদ্ভট খবর শোনালি সকাল সকাল তুই রবিন।বমি আসছে আমার।খাবার টেবিলে তো বসতেই পারবো না।আমি যাচ্ছি ঘুমাতে। শালার সাংবাদিক বেছে বেছে এসব ঘটনায় ফ্রন্ট পেজে হেডলাইন করে দেয়।মনডা যে কি চাই?
আরে বস! যাচ্ছিস কই?আসল কথাই তো শুনলি না।ওয়েট পড়ছি শোন
কি শুনাবি তুই?আজকাল সব কিছু জম্বি মুভির মতো লাগে।মানুষই মানুষ খেকো হয়ে গেছে।আচ্ছা বল বল।সকাল টার তো ১২ টা বেজেই গেছে অর্ধেক খবর পড়ে।বাকিটুকু আর বাদ থাকবে কেন?
তিনজন ব্যবসায়ীর একজনও স্থানীয় নয়।তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো তিনজনের মোবাইল ফোনই হাতে মুঠ করা ছিল।তা থেকেই পুলিশ নিশ্চিত হতে পেরেছে তাদের পরিচয়।তারা হলেন ঢাকার নামকরা ইয়ং বিজনেসম্যান সাহির খান,রনি আকন্দ ও মারুফ খান।
কি! রণ লাফ দিয়ে ওঠে দাঁড়ায়। লও ঠ্যালা।গিরিঙি লাগছে।এখন তো সব প্লান গেলো আওলাঝাওলা হয়ে।এবার কি হবে?
আমিও তো তাই ভাবছি? আর এদেরই বা এতো করুন মৃত্যু কেন হলো? রহস্য টা কি?
ভাই এবার মনে হয় মারাত্মক কেস হাতে নিয়েছিস।খুনী তো সাংঘাতিক রকমের নৃশংস মনে হচ্ছে।
আচ্ছা আমি রেডি হয়ে রওনা হবো এখনি।তুই ওখানকার ওসি কে আমার কথাটা একটু বলে রাখিস।
ঠিক আছে। সাবধানে থাকিস
সমস্যা হলে আমাকে জানাবি কিন্তু।
ওকে।রবিন ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে রাঙামাটির উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলো।
চলবে,,,,